Home / এক্সক্লুসিভ / মুসলিম-অমুসলিম সব দেশেই হালাল সার্টিফিকেশন থাকা জরুরি : আব্দুল কাদের

মুসলিম-অমুসলিম সব দেশেই হালাল সার্টিফিকেশন থাকা জরুরি : আব্দুল কাদের

ইউনাইটেড সার্টিফিকেশন সার্ভিসেস লিমিটেড (ইউনিসার্ট)-এর একজন পরিচালক। সমাজবিজ্ঞান ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনা বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন তিনি। আধুনিকমনা বিজ্ঞানমনস্ক ও পরিপাটি রুচিবোধসম্পন্ন এই তরুণের জন্ম ১৯৮১ সালে নেত্রকোনা জেলার কৃঞ্চপুর গ্রামে। বাবা আবদুল হাকিম এবং মা রাবেয়া খাতুনের সর্বকনিষ্ঠ সন্তান আব্দুল কাদের। বাল্যকাল পরবর্তী সময় এবং পড়াশুনা জীবন ঢাকায় কাটিয়েছেন তিনি।
ISO (International Organization for Standardization) সার্টিফিকেশন নিয়ে কাজ করছেন প্রায় এক যুগ। পাশাপাশি কাজ করছেন হালাল সার্টিফিকেশন নিয়েও। জনাব আব্দুল কাদের ISO 9001, ISO 14001, ISO/IEC 20000-1, OHSAS 18001, ISO/IEC 27001 ইত্যাদি ম্যানেজমেন্ট সার্টিফিকেশন স্ট্যান্ডার্ডগুলোর IRCA (International Register of Certificated Auditors) এবং CMMI SCAMPI-A সার্টিফাইড একজন অডিটর। এছাড়াও ISO/IEC 17011, ISO/IEC 17025, ISO/IEC 17065, ISO/IEC 17021 ইত্যাদি ইন্টারন্যাশনাল ম্যানেজমেন্ট স্ট্যান্ডার্ডগুলোর ওপর থিওরিক্যাল ও প্র্যাক্টিক্যাল জ্ঞানগত ভালো দক্ষতা রয়েছে তার।
বাংলাদেশ, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, তুরস্ক এবং সিঙ্গাপুরের ইন্টারন্যাশনাল বিভিন্ন হালাল সার্টিফিকেশন বডির সাথে জড়িত রয়েছেন জনাব আব্দুল কাদের । বিশ্বময় সার্বজনীন একটি সার্টিফিকেশন বডির স্বপ্ন দেখেন তিনি। এ লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছেন নিরবচ্ছিন্নভাবে। ছাত্রজীবন থেকেই লেখালেখির সাথে জড়িত ছিলেন। প্রবন্ধ-নিবন্ধসহ বেশ কিছু বইও লিখেছেন আব্দুল কাদের। কল সেন্টার এ টু জেড তার সংকলিত সাড়া জাগানো একটি গ্রন্থ।
বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী আব্দুল কাদের তরুণ বয়স থেকে সমাজসেবামূলক, জনহিতকর এবং আর্তমানবতারসেবাধর্মী বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত। তথ্য-প্রযুক্তি, পরিবেশ-স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও ম্যানেজমেন্ট সার্টিফিকেশন সিস্টেম, কোয়ালিটি এবং হালাল সার্টিফিকেশন বিষয়ক অনেক আন্তর্জাতিক কোর্সসহ নানা কর্মশালা ও সভা-সেমিনারে অংশ গ্রহণ করেছেন তিনি। পাশাপাশি ঘুরে বেড়িয়েছেন ভারত, চায়না, মালয়েশিয়া, থাইল্যাণ্ড, সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশ।
হালাল সার্টিফিকেশন ব্যবস্থাপনার সাত-সতেরসহ এই ইন্ড্রাস্ট্রির বহু গুরুত্বপূর্ণ ও জানা-অজানা বিভিন্ন অধ্যায় নিয়ে কথা হয় তার সাথে। গুরুত্বপূর্ণ এই ব্যক্তিত্বের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন প্রিয়.কমের প্রিয় ইসলাম বিভাগের এডিটর ইনচার্জ মাওলানা মিরাজ রহমান ও কনটেন্ট রাইটার মাওলানা মনযূরুল হক

প্রিয়.কম : বাংলাদেশসহ সারা পৃথিবীতে হালাল সার্টিফিকেশনের যে কার্যক্রম চলছে, তার সূচনা ইতিহাস সম্পর্কে অনুগ্রহ করে কিছু বলুন।
আব্দুল কাদের :  বর্তমান বিশ্বে মুসলিমদের জন্য খাদ্যপণ্যের ব্যবহারের সুবিধার্থে হালাল সার্টিফিকেশন নামের একটি সনদ চালু আছে। বিগত বেশ কয়েক দশক আগে থেকেই বিভিন্ন প্রকারের খাদ্যদ্রব্য অমুসলিম দেশের সীমানা পেরিয়ে মুসলিম দেশে রপ্তানির প্রচলন শুরু হয়। এ কারণে ১৯৮০ সালের দিকে হালাল খাবার যাচাই এবং হালাল প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে বিভিন্ন মুসলিম দেশ বেশ কিছু সংস্থা ও কমিটির মাধ্যমে খাবারের হালাল মান নিশ্চিত করতে হালাল সনদ সত্যায়ন করা শুরু করে। এসব দেশের মধ্যে মালয়েশিয়া সরকার বৈশ্বিকভাবে হালাল সনদ সত্যায়নের দিক থেকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে। মালয়েশিয়ান মুসলিম ভোক্তাশ্রেণির দাবিতে মালেশিয়ান সরকারের তত্ত্বাবধানে থাকা ইসলামিক সেন্টারের সহায়তায় একটি জাতীয়  কমিটি গঠন করে। প্রতিষ্ঠার পরপরই সংস্থাটি পুরোদমে কাজ শুরু করে। বিভিন্ন খাবারের দোকান, হোটেল, রেস্তোরাঁ, খাবার প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত টহল অব্যাহত রাখে। সংস্থাটি প্যাকেটজাত এবং খোলা খাবারে যেগুলোতে হালাল প্রতীক বা লোগো সম্বলিত সিম্বল দেখতে পায়, সেগুলো মনিটরিং করতে থাকে। তবে প্রথমদিকে তাদের এ ধরনের অভিযানে মালয়েশিয়ায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। এ উদ্যোগ গ্রহণ করার পর রেস্তোরাঁ মালিক, খাবার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, প্রক্রিয়াজাতকরণ প্লান্ট, হোটেল এবং ফাস্টফুড আউটলেটগুলো সরকারের কাছে একটি হালাল সনদ ইস্যু করার আবেদন করে।  সর্বোপরি হালাল আন্দোলনে মালেশিয়ার অভিজ্ঞতা যে কোনো মুসলিম দেশের জন্য প্রেরণাদায়ক একটি মডেল হয়ে আছে এবং তারা প্রমাণ করতে পেরেছেন যে, এ পদ্ধতি বেশ সুফলদায়ক।
অধিক মুসলিম জনসংখ্যার দেশ ইন্দোনেশিয়াও এক পর্যায়ে শুকরের চর্বিজনিত ভীতির কারণে হালাল সার্টিফিকেট কার্যক্রম শুরু করতে বাধ্য হয় এবং Assessment Institute for Foods, Drugs and Cosmetics নামে একটি সংস্থা প্রতিষ্ঠা করে। এ সংস্থাটি ইন্দোনেশিয়ার সর্বোচ্চ ধর্মীয় উলামা ও স্কলারদের দ্বারা গঠিত মজলিসে উলামা ইন্দোনেশিয়া (Majlis Ulama Indonesia (MUI)  নামের সংগঠনের আওতাধীন হয়ে কাজ শুরু করে।  ইন্দোনেশীয় সরকার আইনের মাধ্যমে সত্যিকারের হালাল খাদ্য বাজারজাত করার বিষয়টি তদারকি করে থাকে এবং ভোক্তাশ্রেণির অধিকার সংরক্ষণ করে থাকে।
সিঙ্গাপুরের বিষয়টি আরও আশাব্যঞ্জক। সেখানে মুসলিমরা সংখ্যালঘু হওয়া সত্ত্বেও সিঙ্গাপুর সরকার MUIS (Majlis Ugama Islam Singapura) প্রতিষ্ঠায় পূর্ণ সমর্থন ও সহযোগিতা করেছে। ইসলামিক সেন্টারটি তাদের সেবা শুরু করার পর ১৯৭৮ সালে হালাল সার্টিফিকেট কার্যক্রম শুরু করে। ঐ বছরই তারা তাদের প্রথম সার্টিফিকেটটি ইস্যু করে। সিঙ্গাপুর পার্লামেন্ট ১৯৯৯ সালে Administration of Muslim Law Act (AMLA) নামে একটি আইন পাশ করে। এই আইনের মাধ্যমে সরকার ইসলামিক সেন্টার অব সিঙ্গাপুরকে মুসলিম জনগোষ্ঠীর জন্য হালাল খাদ্যপণ্য নিশ্চিত করতে যাবতীয় ক্ষমতা প্রদান করে।
এ ধরনের সংস্থা বলবৎ আছে তুরস্ক, থাইল্যান্ড এবং দক্ষিণ আফ্রিকাতেও। তারা স্থানীয় মুসলমানদের জন্য হালাল খাদ্যপণ্যের আমদানি, বিক্রি ও বাজারজাতের বিষয়গুলো যেমন পর্যবেক্ষণ করে, তেমনি আন্তর্জাতিকভাবে বিভিন্ন মুসলিম দেশে রপ্তানি হওয়া খাবারের বিষয়টিও পর্যবেক্ষণ করে থাকে।
মধ্যপ্রাচ্যের আরব দেশগুলো তাদের দেশে রপ্তানি করা খাদ্যপণ্যের জন্য আলাদা উপসাগরীয় মান (Gulf Standards) এবং নীতিমালা নির্ধারণ করে দিয়েছে। উপসাগরীয় দেশগুলোতে রপ্তানি হওয়া গরু ও মুরগির মাংসের জন্য রপ্তানিকারী দেশের নির্ধারিত ইসলামিক সেন্টার কর্তৃক হালাল সার্টিফিকেট এবং আরব চেম্বার অব কমার্স কর্তৃক সত্যায়িত হতে হবে অথবা আমদানিকারী দেশের দূতাবাস কর্তৃক সত্যায়িত হতে হবে। এভাবে ধীরে ধীরে হালাল সার্টিফিকেশনের প্রচার প্রসার সারা বিশ্বে বৃদ্ধি পায়। এখন অনেক দেশ এই হালাল সার্টিফিকেশন নিয়ে গবেষণা করছে। আমার জানামতে বাংলাদেশেও এখন ইসলামিক ফাউণ্ডেশনসহ বেসরকারি কিছু প্রতিষ্ঠান হালাল সার্টিফিকেশন নিয়ে কাজ করছে।

প্রিয়.কম : বিশ্বব্যাপী কতগুলো প্রতিষ্ঠান হালাল সার্টিফিকেশন নিয়ে কাজ করছে ?
আব্দুল কাদের :  বিশ্বব্যাপী কতগুলো প্রতিষ্ঠান হালাল সার্টিফিকেশন নিয়ে কাজ করছে এবং কতগুলো কোম্পানি সার্টিফাইড; এখন পর্যন্ত তার নির্দিষ্ট সংখ্যা কোনো জরিপে উঠে আসে নি। তবে এতটুকু বলতে পারি, বিশ্বব্যাপী হালাল সার্টিফিকেশনের এই কার্যক্রমের একটা সার্বজনীন কন্ট্রোলিং অথরিটির প্রয়োজন। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তুরস্ক এবং মালয়েশিয়া এই বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে।

প্রিয়.কম : হালাল সার্টিফিকেশনের এই কার্যক্রমের সাথে আপনি কেনো জড়িত হলেন ?
আব্দুল কাদের : হালাল বিষয়টা ইসলামি নীতি-আদর্শ এবং পদ্ধতির সাথে সম্পৃক্ত। ইসলামিক স্কলারদের মতে,  ধর্মীয় এসিসমেন্ট বা সার্টিফিকেশন নিয়ে যারা কাজ করেন, তাদের কাজটাও আল্লাহ তায়ালা দাওয়াহ হিসেবে কবুল করে নেবেন। হালাল সার্টিফিকেশন একটা বড় ইন্ডাস্ট্রি। সারাবিশ্বে হালাল সার্টিফিকেশন এখন বিলিয়ন ডলারের মার্কেট। আমি অনেক বছর যাবত সার্টিফিকেশন সেক্টরে কাজ করছি, যেহেতু হালাল সার্টিফিকেশন আমাদের কাজের সাথে সামঞ্জ্যপূর্ণ একটি বিষয় তাই আমি এই কাজের সাথে জড়িত থাকতে চাই।

প্রিয়.কম : মানুষ যাতে শুদ্ধ খাবার খেতে পারে এজন্য হালাল পণ্য গ্রহণ করা এবং যাচাই করে নেওয়ার প্রক্রিয়াটি জরুরি। এখন প্রশ্ন হলো, একটা অমুসলিম দেশে এর প্রয়োজনীয়তা থাকতে পারে। যেহেতু সেখানে হারাম খাবার থাকার সম্ভাবনা বেশি। কিন্তু একটা মুসলিম দেশে পণ্যের হালাল-হারাম সত্যায়ন করার বিষয়টা কি খুব বেশি প্রয়োজন?
আব্দুল কাদের :  হ্যাঁ, সারা বিশ্বে এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।  আমরা যারা হালাল সার্টিফিকেশন নিয়ে কাজ করছি, তারা জানি যে, অনেকগুলো প্রসেসের সমন্বয়ে একটি পণ্য বা কোনো ব্যবস্থাপনাকে হালাল স্বীকৃতি প্রদান করা হয়। আমরা একটি মুসলিম দেশ হিসেবে বাংলাদেশের কথা যদি বলি, যারা খাদ্যজাত দ্রব্য রিলেটিভ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক, তারা তো মুসলমান না-ও হতে পারে। অথবা তারা যদি মুসলিমও হয়, তারা যে-সব উপকরণ ব্যবহার করছেন, সেগুলো হালাল কি না- সেটা যাচাই করাও তো গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়।
একজন মুসলিমও তো হারাম কার্যক্রমের সাথে সম্পৃক্ত থাকতে পারে। অথবা অধিক মুনাফা অর্জন করার লোভে ধোঁকাবাজির আশ্রয় নিয়ে বিভিন্ন অনুপোযুক্ত উপাদান ব্যবহার করে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারে। আবার খাদ্যজাতদ্রব্যের ক্ষেত্রে সে অ্যালকোহল বা অন্যকোনো অবৈধ উপকরণ ব্যবহার করছে কি না সেটা অবশ্যই পরীক্ষা করে দেখতে হবে এবং এই প্রসেস মুসলিম-অমুসলিম সব দেশেই সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সুতরাং আমি বলবো মুসলিম-অমুসলিম সব দেশেই হালাল সার্টিফিকেশনের প্রয়োজন রয়েছে।

প্রিয়.কম : অর্থাৎ আপনি বলতে চচ্ছেন, মুসলিম দেশুগুলোতে হালাল সার্টিফিকেশনের প্রয়োজন রয়েছে সতর্কতার জন্যে…
আব্দুল কাদের :  না, শুধু সতর্কতার জন্যে নয়। বরং পণ্যের মান, উৎপাদন প্রক্রিয়া এবং উপকরণের মান ও বৈধতা যাচাই-বাছাই করে দেখা জরুরি। কোম্পানিগুলো সঠিকভাবে প্রয়োজনীয় ও বৈধ উপাদানগুলো ব্যবহার করছে কি না, হালাল সার্টিফিকেশনের পদ্ধতি মেনে এই প্রক্রিয়ার সঠিক অনুসন্ধান হওয়া জরুরি। আমরা একটা মুসলিম দেশে থাকলেও অমুসলিমদের তৈরি খাবার আমরা খাই, বিভিন্ন অমুসলিম মালিকানাধীন রেস্টুরেন্টে যাই, তাদের রেস্টুরেন্টগুলোতে শরীয়া অনুযায়ী শুদ্ধ পদ্ধতিতে খাবার তৈরি করা হচ্ছে কি না সেটা কিন্তু সঠিকভাবে আমরা জানি না বা জানার উপায়ও নেই। এটা যদিও মুসলিম দেশে এবং  মুসলমানরাই কিন্তু এখানে খাচ্ছে, আমরাই খাচ্ছি।  সুতরাং হালাল সার্টিফিকেশন এ জন্যেই প্রয়োজন যে,  কেউ যেনো নিজের অজান্তেই হারাম না খায়।
আর অমুসলিম দেশগুলোতে হালাল সার্টিফিকেশনের প্রয়োজনীয়তার ব্যাপারটি সবাই জানে। বিশেষ করে চায়না, জাপান- এইসব দেশে গেলে হালাল খাদ্য ও পণ্যের প্রয়োজনীয়তাটি বেশি উপলব্ধি করা যায়।

প্রিয়.কম : কী কী কারণে একটি পণ্য হারাম হতে পারে?
আব্দুল কাদের : একটা পণ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন উপাদান ব্যবহার করা হয়। প্রথম কথা হলো উপাদানগুলো হালাল হতে হবে। কোনো প্রকারের কোনো হারাম উপাদান ব্যবহার করা হলেই পণ্য হারাম হবে। যেমন- কোনো পণ্য তৈরিতে শূকরের কোনো অংশ বা হারাম প্রাণীর চর্বি জাতীয় কোনো কিছু উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা। কিংবা অ্যালকোহল থাকা। এছাড়াও ইউরিনারি (মূত্র জাতীয়) কিছু থাকলে। মূলত ইসলাম যে-সব বিষয়-বস্তু বা পণ্য-উপাদানকে হারাম ঘোষণা করেছে, সেগুলোর কোনো সংমিশ্রণ যদি কোনো খাদ্য-পণ্য বা ব্যবস্থাপনায় থাকে, সেই পণ্য বা সেই ব্যবস্থাপনাটাই হবে হারাম। আমরা যে পশুর মাংস খাচ্ছি, সেটা ঠিকভাবে ইসলামসম্মত উপায়ে জবাই করা হলো না, সেটাও হারাম।
কোনো পণ্য বা ব্যবস্থাপনায় কোনো হারাম উপাদান বা পদ্ধতি মিশ্রিত হচ্ছে কিনা তা অডিট করার জন্যে একজন অডিটর থাকবেন, যিনি সেই কোম্পানি সম্পর্কে ভালো জ্ঞান রাখেন এবং তাদের প্রসেস ও প্রডাক্ট সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা রাখেন। তিনি যাচাই করে নিশ্চিত করবেন যে, এই উৎপাদন প্রক্রিয়া বা পণ্যে যে-সব উপাদন ব্যবহার করা হয়, তা হালাল ।

প্রিয়.কম : কোনো পণ্য বা প্রতিষ্ঠানকে হালাল সার্টিফিকেট প্রদানের পথ ও পদ্ধতি কী কী এবং এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় দিক-বিষয়গুলো কী কী?
আব্দুল কাদের : এখন পর‌্যন্ত কিছু মুসলিম দেশে হালাল সার্টিফিকেশন নিয়ে কিছু স্ট্যান্ডার্ড (মান) রয়েছ। উদারহণ হিসেবে বলতে পারি, মালয়েশিয়ায় হালাল সার্টিফিকেশনের জন্য এমএস১৫০০ এবং এমএস২৪০০ নামক দুটি স্ট্যান্ডার্ড রয়েছে, এই স্টান্ডার্ডের কিছু নীতিমালা আছে- একটা কোম্পানি যদি সার্টিফাইড হতে চায়, তবে হালাল সার্টিফিকেশননের নীতিমালা মেনে তাদের কিছু প্রসেস মেইনটেন করতে হবে। এই প্রসেসটা অডিট করবে একটা সার্টিফিকেশন বডি।
সার্টিফিকেশন বডির একটা নীতিমালা থাকতে হবে, যেই নীতিমালার আলোকে সার্টিফিকেট সরবরাহ করবে তারা। একটা সর্টিফিকেশন বডির অবশ্যই কিছু ইসলামিক স্কলারদের সমন্বয়ে একটা শরীয়া কমিটি করতে হবে, যাদের মাধ্যমে হালাল-হারামের বিষয়গুলো নিশ্চত করা হবে। কমিটির ইসলামিক স্কলারদের ইসলামিক নীতিমালা অনুযায়ী ফতোয়া দেয়ার মতো যোগ্যতা থাকতে হবে। তারাই মূলত এই কার্যক্রমগুলো চালাতে পারবে। এটা যেহেতু একটি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের একটি অংশ, সুতরাং ম্যানেজমেন্ট বিষয়ক বিভিন্ন জ্ঞান থাকতে হবে- উদারহণত বিভিন্ন কোম্পানির সাথে মিটিং করা, তাদের পণ্যের চেইন অপারেশনগুলো দেখা, কী কী উপাদান ব্যবহার করছে, সেটা চেক করার ব্যবস্থা থাকতে হবে।
হালাল সার্টিফিকেশনের ক্ষেত্রে উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত কিছু পণ্যের গুনগত মান নিশ্চত করার জন্য পণ্যের টেস্ট রিপোর্টও দরকার পরে।  এ ছাড়া যারা অডিটর থাকবে, তাদেরও এ সম্পর্কে জ্ঞান-গবেষণা থাকতে হবে। বিশেষভাবে যে বিষয়টি নিয়ে সে কাজ করছে, সে সম্পর্কে জানাশোনা থাকতে হবে এবং একইসাথে তাদের এডুকেশনাল ব্যাকগ্রাউন্ডও থাকতে হবে সে বিষয়ে। ধরুন এটা যদি হালাল কনস্ট্রাকশন বিষয়ক হয়, তবে তার কনস্ট্রাকশন বিষয়ে একাডেমিক ব্যাকগ্রাউন্ড থাকতে হবে। এটা যদি হালাল ফুড সার্টিফিকেশন হয়, তবে তার ফুড চেইন সম্পর্কে একাডেমিক ব্যাকগ্রাউন্ড থাকতে হবে।

প্রিয়.কম : হালাল সার্টিফিকেট ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিশ্বের কোথাও কোনো একাডেমিক পড়াশুনা আছে কিনা?
আব্দুল কাদের : আমি সারা বিশ্বের কথা বলতে পারবো না। ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব মালয়েশিয়াতে এ বিষয়ে একটা প্রোগ্রাম আছে, হালাল সার্টিফিকেশন নিয়ে তাদের ওখানে কিছু কোর্স চালু রয়েছে। বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত এটা নিয়ে কোনো পড়াশুনার ব্যবস্থা আমার চোখে পড়ে নি। তবে আমাদের প্রতিষ্ঠানের আন্তর্জাতিক মানের হালাল সার্টিফিকেশন লিড অডিটর কোর্স করানোর সক্ষমতা রয়েছে।

প্রিয়.কম : একটা কোম্পানি কেনো হালাল সার্টিফিকেশন নেবে ?
আব্দুল কাদের : একটি প্রতিষ্ঠান মূলত তার পণ্যের গুণগত মান নিশ্চত করা এবং ব্যবসা করা উভয় উদ্দেশ্যেই হালাল সার্টিফিকেট নিবে। কারণ সার্টিফিকেটহীন পণ্যের তুলনায় সার্টিফাইড কোম্পানির পণ্য ব্যবসা সফল হয়। হালাল সার্টিফাইড পণ্যের ওপর মানুষের আস্থা বেশি, তা-ই সে কিনবে বেশি। একই সাথে সে যদি নিশ্চিত করতে চায় যে, তার কোম্পানির পণ্য হালাল, এ জন্যও তাদের সার্টিফিকেটটা দরকার হবে। হালাল সার্টিফিকেশন চালুর ইতিহাস দেখলেও কিন্তু আমরা এমনটাই দেখি যে, প্রথম প্রথম ব্যবসায়ীরা হালাল সার্টিফিকেশন নেন নি। পরবর্তী সময়ে অধিক মুনাফা দেখে একই ব্যবসায়ীরা নিজ উদ্যোগে হালাল সার্টিফিকেট নিয়েছে।

প্রিয়.কম : একটি প্রতিষ্ঠান কি নিজস্ব প্রক্রিয়ায় পণ্য হালাল হওয়ার বিষয়টি নিশ্চত করতে পারে না? অন্য একটা কোম্পানির কাছ থেকে হালাল সার্টিফিকেট নেয়ার প্রয়োজন কতটুকু ?
আব্দুল কাদের :  হ্যাঁ, এমনটা তো এখন বাংলাদেশে অহরহ হচ্ছে। প্রত্যেকটা কোম্পানির পণ্যের গায়ে হালাল লেখা দেখছি আমরা। এরপরও হালাল সার্টিফিকেশনের কাজ কেনো দরকার? কারণ, তাদের কাজটা প্রশ্নবিদ্ধ। একটা কোম্পানি যদি কোনো পণ্য তৈরি করে, তবে  বিজনেসের স্বার্থে এটা হালাল পণ্য বা ১০০% হালাল পণ্য বলে দিতেই পারে। কিন্তু সেটার সত্যতা কে যাচাই করবে? এখানে একটা তৃতীয়পক্ষ অবশ্যই থাকা উচিত, যারা পণ্যের গুণগত মান পরীক্ষা করার পর নিশ্চয়তা দেবে যে, এটা একটা হালাল পণ্য। আর এ জন্যেই সার্টিফিকেশন বডিগুলো সারা বিশ্বের কাজ করছে।

প্রিয়.কম : কোনো প্রতিষ্ঠান যদি ব্যাংকের শরীয়াবোর্ডের মতো নিজস্ব একটা শরীয়া বোর্ড গঠন করে, যাদের মাধ্যমে পণ্য হালাল হওয়ার বিষয়টি নিশ্চত করবে, তাহলে তৃতীয়পক্ষের প্রয়োজন হবে কেনো ?
আব্দুল কাদের :  আমার জানা মতে, ব্যাংকিং সেক্টরে প্রতিটি ইসলামি ব্যাংকের নিজস্ব শরীয়াবোর্ড থাকার পাশাপাশি একটি সেন্ট্রাল শরীয়া বোর্ড রয়েছে। প্রতিটি ব্যাংক তাদের মধ্যস্থতায় অডিট পরিচালনা করে থাকে। একটি কোম্পানিতে যখন কোনো শরীয়াহ কমিটি তৈরি করা হবে, তখন সেটা কেবল ঐ কোম্পানির ব্যবসার কথা চিন্তা করেই করা হবে। কোম্পানিটি সব সময় চাইবে তার ব্যবসা যেনো বেশি হয়। ঐ কোম্পানির মালিক বা ম্যানেজমেন্ট যখন কোনো পণ্যটাকে হালাল হিসেবে অনুমোদন দিতে বলবে, প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা হিসেবে একজন শরীয়াহ কর্মচারী সেটা করে দিতে অনেকটাই বাধ্য থাকবে। সুতরাং এখানে পক্ষপাতিত্ব করার সুযোগ রয়েছে কিন্তু একটা তৃতীয় পক্ষ যখন অডিট করবে, তখন সেখানে কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট (পক্ষপাতিত্ব করার সুযোগ) থাকে না।

প্রিয়.কম : বাংলাদেশে হালাল সার্টিফিকেশনের অবস্থা এবংকার্যক্রম এখন কোন পর্যায়ে আছে?
আব্দুল কাদের : আমি যদি বাংলাদেশের হালাল সার্টিফিকেশন শিল্প সম্পর্কে বলতে চাই, তাহলে বলবো, বাংলাদেশের বেশিরভাগ কোম্পানি এখন পর্যন্ত হালাল সার্টিফিকেশনের নীতিমালা অনুসরণ করছে না। তারা তাদের নিজস্ব অনুমোদন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পণ্যগুলো হালাল বলছে। মূলত এগুলো কি হালাল? আমি যতদূর জানি, বিএসটিআই বাংলাদেশে হালাল সার্টিফিকেশন নীতিমালা তৈরি করার জন্য কাজ করছে। এছাড়া বাংলাদেশে আরও কিছু সার্টিফিকেশন বডি হালাল সার্টিফিকেশনের কাজ করছে।

প্রিয়.কম : জাতীয় বা আন্তর্জাতিকভাবে হালাল সার্টিফিকেশন নিয়ে কাজ করার কোনো পরিকল্পনা আপনাদের  রয়েছে কি ?
আব্দুল কাদের :  বাংলাদেশে আমরা ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম সার্টিফিকেশন বডি হিসেবে কাজ করছি, আমাদের এখনকার ফোকাস হচ্ছে, হালাল সার্টিফিকেশনটাকে বাংলাদেশ মার্কেটে কিভাবে বৃদ্ধি করা যায়। মালয়েশিয়ার সরকার আন্তর্জাতিক একটা প্লাটফর্ম তৈরি করতে বিভিন্নভাবে চেষ্টা করছে, যার মাধ্যমে সারা বিশ্বের হালাল ইন্ডাস্ট্রিকে কন্ট্রোল করা যাবে। আমি নিজেও তাদের সঙ্গে কাজ করছি।
তুরস্কের একটা বডি আছে, সেটা হচ্ছে SMIIC। এটা অনেকগুলো মুসলিম দেশের সঙ্গে সংযুক্ত হয়েছে, বাংলাদেশও আছে।  এটা তুরস্কের সরকারের একটা প্রতিষ্ঠান। এর পুরো নামটা হচ্ছে, দ্য স্ট্যান্ডার্ড অব মেট্রোলজিক ইনস্টিটিউট ফর ইসলামিক কান্ট্রিজ। অনেকগুলো দেশ তাদের সাথে একাত্মতা পোষণ করেছে এবং আমরাও বিভিন্নভাবে তাদের সাথে কাজ করার পরিকল্পনা করছি।

প্রিয়.কম : ওআইসি (অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কোঅপারেশন) হালাল সার্টিফিকেশন নিয়ে কোনো কাজ করছে কি না ?
আব্দুল কাদের : আমার জানামতে, ওআইসি (অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কোঅপারেশন)  হালাল সার্টিফিকেশন ও ইসলামি বিভিন্ন কাজের ব্যাপারে বিভিন্ন সচেতনতা সৃষ্টি করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তুরস্ক, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে সচেতনতা সৃষ্টি করার জন্যে বিভিন্ন প্রোগ্রাম করছে তারা।

প্রিয়.কম : হালাল সার্টিফিকেশন দেশভিত্তিক হওয়া ভালো নাকি আন্তর্জাতিক হতে হবে?
আব্দুল কাদের : এটা আসলে আগ্রহ এবং প্রয়োজনীয়তার ওপর নির্ভর করে। আন্তর্জাতিক হওয়া এই জন্য ভালো কারণ বিভিন্ন মুসলিম দেশগুলোর ইউরোপ-আমেরিকার মতো বিভিন্ন অমুসলিম দেশগুলো সাথে পণ্য আমদানি-রফতানি বিষয়ককার্যক্রমে যুক্ত। সুতরাং এখানে প্রশ্ন হচ্ছে যে, তাদের চাহিদা কী? তারা হালাল স্ট্যান্ডার্ড অনুসরণ করছে কি না? যদি অনুসরণ করে তাহলে প্রশ্ন হবে, কোন স্ট্যান্ডার্ড অনুসরণ করছে, সেটা কি দেশভিত্তিক স্ট্যান্ডার্ড নাকি আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ড? আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ড অনুসরণ করা হলে, আগ্রহের পরিমাণটা বেশি লক্ষ করা যায়। আর যদি দেশভিত্তিক স্ট্যান্ডার্ডের বিষয় আসে, তখন প্রাধান্য কম পায়। প্রত্যেকটা দেশে এ ক্ষেত্রে একটা দেশভিত্তিক বডি থাকতে পারে, যারা আন্তর্জাতিক বডির সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে।

প্রিয়.কম : আমরা জেনেছি যে, হালাল সার্টিফিকেশনের কাজটা দাওয়াহ হিসেবে পরিগণিত হবে কিংবা এটা একটা ইসলামিক কাজ। তো এমন একটা ইসলামিক কাজকে কোনো বিজনেস হিসেবে নেয়াটা ঠিক হবে কি না ?
আব্দুল কাদের : যারা হালাল সার্টিফিকেশনের কাজটা করবে, সেখানে মান রক্ষা করার জন্য তাদের অর্থনৈতিক দিকটা অবশ্যই ভাবতে হবে। কারণ এখানে  ব্যবস্থাপনার বিষয় আছে, পণ্য-জনবল রক্ষণাবেক্ষণের বিষয় আছে, আর এসবের জন্য অর্থের অবশ্যই প্রয়োজন। সুতরাং অবশ্যই এখানে অর্থনৈতিক একটা আগ্রহ কাজ করবে। আর দাওয়াহটা মূলত ডিপেন্ড করে পার্সন টু পার্সন। হালাল সার্টিফিকেশনটা যদিও একটা ধর্মীয় কাজ তদুপরি এটা একটি ইন্ডাস্ট্রি।
উদাহরণত ধরুন, আপনার যদি একটা বিজনেস কোম্পানি থাকে, তবে আপনি কেনো হালাল সার্টিফিকেট নিচ্ছেন? নিচ্ছেন আপনার ব্যবসার জন্যে। আপনি যখন ব্যবসার জন্যে নিচ্ছেন, যে আপনাকে সার্টিফিকেশন দিচ্ছে, তারও তো অবশ্যই একটা ব্যবসায়িক আগ্রহ থাকতে পারে। সে এখানে পরিশ্রম করবে, একটি কোম্পানির মাধ্যমে আপনাকে সনদ প্রদান করবে। একটা কোম্পানির যদি মুনাফা না থাকে, তাহলে তো সে ঠিকে থাকতে পারবে না। হ্যাঁ, এখানে যদি কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠান উদ্যোগ নেয় যে, তারা অলাভজনকভাবে কার্যক্রম চালাবে, তবে সেটা তাদের জন্যে সম্ভব।

প্রিয়.কম : হালাল সার্টিফিকেশনের এই কার্যক্রম কি শুধু কোনো পণ্যের সাথে সম্পর্কিত নাকি যে-কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যবস্থাপনাকেই হালাল সার্টিফিকেশনের আওতায় আনা যায়?
আব্দুল কাদের : হালাল সার্টিফিকেশনের বেশ কয়েকটি দিক রয়েছে। একটা হচ্ছে পণ্যকেন্দ্রিক আরেকটা হচ্ছে সিস্টেম বা ব্যবস্থাপনাকেন্দ্রিক। প্রথমটাতে উপকরণ-উপাদান পরীক্ষা করে সার্টিফেকশন প্রদান করা হয় আর দ্বিতীয়টা ম্যানেজমেন্ট প্রসেসের সাথে জড়িত। শুধু পণ্য ঠিক আছে, কিন্তু ডেলিভারির ক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনা ঠিক নেই, সেটা তো হতে পারে না। এ ছাড়াও আছে হালাল কনস্ট্রাকশন, হালাল শপ, হালাল ট্রাভেল ইত্যাদি।

প্রিয়.কম : সারা বিশ্বে যে হালাল সার্টিফিকেশন ব্যবস্থপনা চালু আছে, এর সাথে আলেম-ওলামার সম্পর্ক একটু কম দেখা যায়, এর কারণ কী?
আব্দুল কাদের :  হালাল সার্টিফিকেশন যেহেতু একটা নতুন বিষয়, যারা মাওলানা কিংবা মুফতি তারা এই বিষয়টাতে বেশি একটা সম্পৃক্ত নন। এর কারণ হয়তো এটাও হতে পারে যে, আলেমদের এই ইন্ড্রাস্ট্রিতে আগ্রহ কম। বাংলাদেশের সেক্টরে আলেম-ওলামার সম্পৃক্ততা কম হলেও বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত দেশের আলেম-ওলামারা এই সেক্টরে বেশ ভালো কাজ করছেন।

প্রিয়.কম : ইসলামের আদর্শ যুগে হালাল সার্টিফিকেশনের প্রদানের কোনো ব্যবস্থাপনা ছিলো কিনা?
আব্দুল কাদের : আমার জানা মতে, ইসলামের আদর্শ যুগে এখনকার মতো ফুড প্রসেস ছিলো না। এখন এই প্রসেসিং তৈরি হয়েছে। তখনকার দিনে খাবারের তালিকাও কম ছিলো।  তখন তারা খেজুর থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রাকৃতিক বিশুদ্ধ খাবার বেশি খেতেন। সেই যুগে কোনো উপাদান মিশ্রণের মাধ্যমে খাবার তৈরির কোনো ব্যাপার ছিলো না। কিন্তু এখন হচ্ছে। এখন কিন্তু প্রাকৃতিক বিশুদ্ধ খাবার আমরা তেমন পাচ্ছি না। যেমন, কোথাও থেকে একটা পণ্য আসছে। সেটা ১০-১৫ দিন আগে ফ্রিজিং করে আনা হচ্ছে। ফ্রিজিং করে আসছে বিভিন্ন মাছ বা খাবার। এগুলো স্টক করার জন্যে বিভিন্ন মেডিসিন ব্যবহার করা হচ্ছে। এছাড়া বিভিন্ন দেশ তাদের গবেষণা অনুযায়ী নতুন নতুন খাবার তৈরি করছে। সুতরাং এ জন্যে গুরুত্বপূর্ণ এই প্রশ্নটা সামনে চলে আসে যে, মেডিসিন বা উপাদানের ক্ষেত্রে ইসলাম যেগুলো হালাল বলে ঘোষণা করেছে, সেইগুলি ব্যবহার করা হচ্ছে কি না? নাকি অন্য কেনো হারাম উপাদান ব্যবহার করা হচ্ছে? এগুলিই হচ্ছে সতর্কতার বিষয়। ইসলামের আদর্শ যুগে প্রসেসড ফুডের কোনো ব্যবস্থা ছিলো না, যা এখন আছে। সুতরাং তখন প্রয়োজন ছিলো না বলে এখন হবে না- এমনটা ভাবা ঠিক নয়।

প্রিয়.কম : আমাদের জানা মতে, আপনি প্রায় একযুগ ধরে সার্টিফিকেশন নিয়ে কাজ করছেন। এই দীর্ঘ সময়ে আপনার অভিজ্ঞতা বা অর্জন কী, সেগুলো যদি আমাদেরকে একটু শেয়ার করতেন।
আব্দুল কাদের : আমি দীর্ঘদিন যাবত ম্যানেজমেন্ট সার্টিফিকেশন নিয়ে কাজ করছি। আইএসও, সিএমএমআই এবং এমন অনেক ইন্টারন্যাশনাল সার্টিফিকেশন এক্টিভিটি আছে, যেগুলোর সঙ্গে আমি সম্পৃক্ত আছি। হালাল সর্টিফিকেশনের সঙ্গে জড়িত হয়েছি কয়েক বছর আগে। আমার অভিজ্ঞতা হলো- এই শিল্পে কাজ করার জন্য অনেক জ্ঞান অর্জন করা এবং কঠোর পরিশ্রমী হওয়া বাঞ্চণীয়।

প্রিয়.কম : কোনো পণ্যের হালাল হওয়া বুঝানোর জন্য পণ্যের গায়ে হালাল লোগো লাগিয়ে দেওয়া হয়। মানুষকে সচেতন করা জন্য এই পদ্ধতিটুকুই কি যথেষ্ট, নাকি অন্য কোনো পদ্ধতিতে অবলম্বন করা যায় ?
আব্দুল কাদের : হালাল সার্টিফিকেশন ইন্ডাস্ট্রিতে এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এটাকে আমরা সার্টিফিকেশন মার্ক (লোগো) বলে থাকি। আমরা বাংলাদেশে যেটা দেখে থাকি যে, প্যাকেটের গায়ে হালাল বা ১০০% হালাল লেখা থাকে। এটা এই কথা প্রমাণ করে না যে, তাদের পণ্য হালাল। কেননা, এটা কেবল তাদের নিজস্ব ঘোষণা। কিন্তু আন্তর্জাতিকভাবে আমরা যে ম্যানেজমেন্ট সার্টিফিকেশন করে থাকি, তার একটা বিশ্বাসযোগ্য পদ্ধতি আছে। আর তা হচ্ছে, সার্টিফিকেশন বডি যে অ্যাক্রিডিটেশন থেকে অনুমোদিত, তার লোগো থাকে এবং সার্টিফিকেশন বডিরও লোগো থাকে। এতে বোঝা যায় যে, এই কোম্পানিটা এই সার্টিফিকেশন বডি থেকে এবং অ্যাক্রিডিটেশন বডি থেকে অনুমোদন পেয়েছে।

প্রিয়.কম : ধরুন আমি দেখলাম একটা পণ্যতে হালাল লোগো লাগানো আছে, এর মানে কি যেটাতে হালাল লোগো নেই, সেটা হারাম ?
আব্দুল কাদের :  বিষয়টা এরকম নয়। বরং হালাল লোগোটা লাগানোর মানে হচ্ছে, তারা নিশ্চয়তা দিচ্ছে যে, তারা কোনো তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে পণ্যটি হালাল হওয়ার সত্যায়ন পেয়েছে। অন্য একটা কোম্পানি, যাদের পণ্যে হালাল লোগো নেই, এর মানে এটা নয় যে, তারা হারাম। পুরো ব্যাপারটা কোম্পানির পণ্য তৈরির সময়কার হালাল নীতিমালা মেনে চলার ওপর নির্ভর করে। সাধারণ জনগণ যখন কোনো পণ্যের গায়ে হালাল লোগো লাগানো দেখে, তখন তাদের মাঝে একটি বিশ্বাস সৃষ্টি হয় যে, এই পণ্যটি তৈরির সময় হালাল নীতিমালা বা পদ্ধতি মান্য করা হয়েছে।

প্রিয়.কম : আপনাদের জরিপে এমন কী কী পণ্য আছে, যেগুলোর মধ্যে হারাম উপাদান আছে ? এটা এই জন্যে জানতে চাচ্ছি, একসময় আমাদের দেশে একটা ফতোয়া প্রচারিত হয়েছিলো, যেখানে বিভিন্ন কোম্পানির নাম ও পণ্যের কথা লেখা ছিলো যে, এগুলো মুসলিমরা খেতে পারে না কারণ এগুলো হারাম। তেমন কোনো তালিকা আপনাদের আছে কি না ?
আব্দুল কাদের :  না, আমার জানা মতে, এখন পর্যন্ত এমন কোনো সার্ভে রিপোর্ট বাংলাদেশে তৈরি হয় নাই। এমন কোনো গাইড লাইনও তৈরি হয় নেই যে, কে বা কারা এই ধরনের সিদ্ধান্তগুলো পরচিালনা করবে এবং কারা হালাল-হারাম পণ্যের তালিকা তৈরি করে জনগণের সামনে তা প্রকাশ করবে।

প্রিয়.কম : আমরা দেখি যে, বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন অমুসলিমরা হালাল সার্টিফিকেশন নিয়ে কাজ করছে। এটা কীভাবে সম্ভব?
আব্দুল কাদের : হালাল সার্টিফিকেশন নিয়ে কাজ করছে এমন কিছু অমুসলিম কর্মীদের আমি জানি বা চিনি- আমিও তাদেরকে এই প্রশ্নটা করেছিলাম। তারা বলেছে যে, তাদের দেশে যেসব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বা সংগঠন হালাল নিয়ে কাজ করছে তাদের সাথে সম্পর্ক রেখে তারা কাজটা করছে। মুসলিম স্কলারদের দ্বারা পরিচালিত বা প্রতিষ্ঠিত তৃতীয় কোনো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অডিট অথবা অনুমোদনগত সহযোগিতা নিয়ে তারা হালাল সার্টিফিকেটের কার্যক্রমটা চালাচ্ছে। আমি তাদের এই প্রশ্নও করেছিলাম যে, কীভাবে তারা কাজ করে? তারা বলেছে যে, তাদের যে অথরাইজ বা অডিটর বডি আছে, তাদের মাধ্যমে নিয়মিত অডিট করে কাজগুলো সম্পাদন করা হয়। তারা আরো বলেছে যে, অনেক মুসলিম স্কলার অডিটর তাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত আছেন এবং অমুসলিমও আছেন। একটা হালালের গাইড লাইন করা আছে, সেই গাইড লাইনের চেক লিস্ট ধরেই অমুসলিম অডিটররা মূলত অডিট করে আসেন।

প্রিয়.কম : সুদীর্ঘ সাক্ষাৎকার দেওয়ার জন্যে আপনাকে ধন্যবাদ।
আব্দুল কাদের : গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়ে ওপর সাক্ষাৎকার গ্রহণের এমন মহতি উদ্যোগ নেওয়ার জন্যে প্রিয় ডটকম পরিবারসহ আপনাদের সবাইকে ধন্যবাদ।

Check Also

screenshot_17

বাসর ঘরে কিভাবে ইঞ্জিন স্টার্ট দিবেন দেখে নিন।

বাসর ঘরে কিভাবে ইঞ্জিন স্টার্ট দিবেন দেখে নিন। বাসর ঘরে কিভাবে ইঞ্জিন স্টার্ট দিবেন দেখে নিন। বাসর …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *