Home / অপরাধ / সাহসী এক শারমিনের কথা

সাহসী এক শারমিনের কথা

সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়লে শিউরে উঠি। বয়স কম হলেও এটুকু বুঝতে পারছিলাম, আমার ওপর যা হচ্ছে তা পুরোপুরি অন্যায়। আমার মায়ের ইচ্ছায়, পৃষ্ঠপোষকতায় সেই অন্যায় সিদ্ধান্ত আমার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছিল। একে তো আমার বিয়ের বয়স হয়নি। হঠাৎ মা একদিন বললেন, “এই ছেলে তোর স্বামী, এখন থেকে পড়াশোনা বন্ধ করে ওর সঙ্গে ঘর-সংসার করতে হবে তোকে!” নিছক কৌতুক করে তিনি এটা বলেননি। সত্যি সত্যিই বলেছিলেন। সে মতো কাজও করলেন।

আমাকে ওই ছেলের সঙ্গে একটি ঘরে থাকার নির্দেশ দিলেন। এমনকি ইচ্ছার বিরুদ্ধে এক ঘরে ঢুকিয়ে দিয়ে বাইরে থেকে আটকেও রাখলেন। কিন্তু আমার তো বিয়ে হয়নি। বিয়ের বয়সও হয়নি। বিয়ের আয়োজন হয়নি, কবুল বলিনি, কোনো কাগজে সইও করিনি। কীভাবে এটা হলো। এমন পরিস্থিতিতে নিজেকে খুব অসহায় লাগছিল।’ কথাগুলো শারমিন আক্তারের, যার বয়স মাত্র ১৪। সে ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার পাইলট মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ে দশম শ্রেণির ছাত্রী।
৭ নভেম্বর যখন কথা হচ্ছিল শারমিনের সঙ্গে, তখন তার এই অভিজ্ঞতার কথা যেন থামে না। সে বলে, ‘আমি বিয়ের ব্যাপারে শুরুতেই মাকে না করে দিই। কিন্তু মা কিছুতেই এটা মানেননি বরং চাপ প্রয়োগ করেছেন। শারীরিক নির্যাতন করেছেন। এমন পরিস্থিতিতে আমি কী করব, কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। বাবা বিদেশে থাকেন। কার কাছে যাব, কী করব, সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলাম না। একবার চিন্তা করি আত্মহনন করে এই নরকযন্ত্রণা থেকে মুক্ত হব। আবার ভাবি, এটাও হবে হেরে যাওয়া।’
কিন্তু হেরে গেলে তো চলবে না। তাই এই চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে শারমিন। ‘সিদ্ধান্ত নিই, যে করেই হোক আমাকে এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। এরপর নিজে থেকেই সাহসী হলাম। একদিন বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়ে এক সহপাঠীকে বিষয়টি জানাই। এরপর চলে যাই সরাসরি থানায়। মা আর ওই ছেলের বিরুদ্ধে মামলা করি।’
ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার সত্যনগর গ্রামের কবির হোসেনের মেয়ে শারমিন। মা গোলেনূর বেগম। কবির হোসেন সৌদিপ্রবাসী হওয়ায় শারমিনকে নিয়ে তার মা গোলেনূর রাজাপুর শহরের থানা সড়কে ভাড়া বাড়িতে থাকতেন।
২০১৫ সালের জুলাই মাসের কথা। শারমিন তখন রাজাপুর পাইলট বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্রী। মা গোলেনূর এই বয়সেই শারমিনের বিয়ে ঠিক করেন প্রতিবেশী স্বপন খলিফার (৩২) সঙ্গে। শারমিন মায়ের এই সিদ্ধান্তে রাজি না হওয়ায় নানাভাবে চাপ প্রয়োগ করেন। এতেও টলেনি সে। পরে শুরু হয় শারীরিক নির্যাতন। এতেও রাজি না হওয়ায় একদিন ওই ছেলেকে (স্বপন) বাড়িতে এনে শারমিনকে তার মা বলে দেন, ‘এই ছেলে তোর স্বামী। ওর সঙ্গে তোর বিয়ে হয়েছে। এখন ওর সঙ্গে ঘর-সংসার করতে হবে।’ মায়ের কথা শুনে শারমিনের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। স্কুলে আসা বন্ধ করে বাসার মধ্যে আটকে রাখা হলো তাকে। বাইরে গেলেও ছিল কড়া নজরদারি।
২০১৫ সালের ৬ আগস্ট। শারমিনকে চিকিৎসা করানোর কথা বলে তার মা খুলনায় নিয়ে যান। সেখানে গিয়ে দূর সম্পর্কের এক মামার বাড়িতে তোলেন। সেখানে আগে থেকেই ছিলেন স্বপন। রাতে শারমিনকে ওই বাসায় স্বপন খলিফার সঙ্গে এক কক্ষে থাকার জন্য তার মা চাপ দিচ্ছিলেন। তাতে সম্মত না হওয়ায় মারধর করে তাকে (শারমিন) জোর করে স্বপনের ঘরে ঢুকিয়ে দিয়ে বাইরে থেকে দরজা আটকে দেন। ৭ আগস্ট সকালে শারমিন ওই বাসা থেকে কৌশলে পালিয়ে রাজাপুরের উদ্দেশে রওনা দেয়। স্বপন ও তাঁর লোকজন শারমিনের পিছু নেন। পিরোজপুরে এসে কথিত স্বামী স্বপন ও তাঁর লোকজন শারমিনকে ধরে ফেলেন এবং বাস থেকে নামিয়ে রাজাপুরে নিয়ে যান। এখানে এনে শারমিনদের থানা সড়কের বাড়িতে আটকে রাখেন।
১৬ আগস্ট এই বন্দিদশা থেকে পালিয়ে সহপাঠী নাদিরা আক্তারের বাড়িতে যায় এবং সব খুলে বলে। এরপর দুজনে মিলে স্থানীয় সাংবাদিকদের সহায়তায় সরাসরি ওই দিন রাতে রাজাপুর থানায় হাজির হয়। মা ও কথিত স্বামীর বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করে। পরে পুলিশ শারমিনের মা গোলেনূর বেগম ও কথিত স্বামী স্বপন খলিফাকে গ্রেপ্তার করে। আর তাকে ঝালকাঠির জেলা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন বিশেষ ট্রাইব্যুনাল-১–এর বিচারক মো. শফিকুল করিম তার দাদি দেলোয়ারা বেগমের জিম্মায় দেন। এরপর থেকে সে দাদির কাছে থেকেই পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে। শারমিনের এই সাহসিকতার জন্য স্বর্ণকিশোরী ফাউন্ডেশন ২০১৫ সালে তাকে স্বর্ণকিশোরী পুরস্কার দেয়।
এখন লক্ষ্য কী? শারমিন দৃঢ়তার সঙ্গে বলে, ‘আমি পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চাই। আইনজীবী হওয়ার ইচ্ছা আছে। আর বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে প্রচার-প্রচারণা এবং সচেতনতা বাড়ানোর জন্য কাজ করতে চাই।’
তার দাদি দেলোয়ারা বেগম এখন শারমিনকে নিয়ে এই বাড়িতেই থাকেন। সবুজ ছায়াঘেরা সত্যনগর গ্রামে তাদের বাড়িটা বেশ নির্জন-নিরিবিলি। দেলোয়ারা বেগম বললেন, ‘ওরে নিয়া খুব চিন্তা আমার। প্রতিদিন স্কুলে নিয়া যাই, আবার সঙ্গে নিয়া আসি। বাইরে কোথাও গেলে সঙ্গে যাই। ওর জীবনটা ধ্বংসের মুখে ফেলে দিয়েছিল ওর মা। খুব সাহস করে একাই এর প্রতিবাদ করেছে। শত বাধা-বিপত্তির মধ্যেও নিজের সিদ্ধান্ত পাল্টায়নি। এখন সবাই ওকে নিয়ে গর্ব করে। আমরাও গর্বিত।’
শারমিনকে সাহায্য করেছিল সহপাঠী নাদিরা আক্তার। সে বলল, ‘ভালো লাগছে ওর দুঃসময়ে আমি পাশে ছিলাম।’
সত্যনগর গ্রামের ছোট্ট খালের পাড় ধরে ফেরার সময় পশ্চিমাকাশে গোধূলির রক্তিম আভা ছড়িয়ে পড়ছিল। কুয়াশায় ধূসর হয়ে উঠছিল সবুজ গ্রাম। তখনো কানে বাজছিল শারমিনের সাহসিকতার গল্প।

Check Also

sylheti girl

কথা গুলো শুনে চোখের পানি ধরে রাখতে পারলাম না…ভাইরে প্রেমে এত কষ্ট কেরে

কিছু কিছু মানুষ প্রেম করে শুধুমাত্র নিজের চাহিদা মেটানোরর জন্য তারা কখনওই মন থেকে কাউকে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *